ওয়েবসাইট কোথায় তৈরি করবো, এটা আমাদের খুব কমন একটা সমস্যা। এত এত কোম্পানির এত এত অফার। আলাদা আলাদা প্রাইস, ফিচারস। একই ওয়েবসাইট কেউ ৫০ হাজার টাকাতে তৈরি করছে, আবার কেউ ৫ হাজার টাকাতেও তৈরি করছে। পার্থক্যটা কি? এটা সাধারণের জন্য বোঝাটা আসলেই একটু জটিল। আজকে আমরা চেষ্টা করবো সংক্ষেপে কিছু বিষয় আলোচনা করতে।

প্রথমত ওয়েবসাইট দুই ধরনের,

  • স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট
  • ডায়নামিক ওয়েবসাইট

স্ট্যাটিক ওয়েবসাইটে তেমন কোন ফিচার প্রোগ্রামিং করা থাকে। ওয়েবসাইটের মালিকের জন্য কোন এডমিন প্যানেল থাকে না। নিয়মিত পরিবর্তন করা যায় না। কালেভদ্রে কোন পরিবর্তন করতে হলেও তাকে ছুটে যেতে হয় ডেভেলপারের কাছে। স্ট্যাটিক ওয়েবসাইট আগে একসময় খুব প্রচলিত থাকলেও বর্তমানে আর এর প্রচলন নেই তেমন।

অন্যদিকে ডায়নামিক ওয়েবসাইটের মালিকের জন্য এডমিন প্যানেল থাকে। এডমিন প্যানেলে লগ ইন করে মালিক যে কোন সময় তার ওয়েবসাইটের যে কোন কিছু পরিবর্তন, পরিবর্ধন করতে পারে। ছোটখাট কোন চেঞ্জের জন্য তাকে আর ডেভেলপারের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হয়না। নিজে পোস্ট দিতে পারে, এডিট, ডিলিট সহ যে কোন কিছু করতে পারে।

নোটঃ বর্তমানে বাজারে প্রচলিত সমস্ত ওয়েবসাইটই ডায়নামিক

ডায়নামিক ওয়েবসাইট কয় ধরনের হয়?

  • সরাসরি কোডিং / প্রোগ্রামিং করে তৈরি (যেমন, Raw PHP)
  • ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে প্রোগ্রামিং করে তৈরি (যেমন, Laravel, Codeigniter ইত্যাদি)
  • কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) দিয়ে তৈরি।

এখন আমরা এই ধরনের ডায়নামিক ওয়েবসাইটের বিস্তারিত জানবো।

সরাসরি কোডিং / প্রোগ্রামিং করে ওয়েবসাইট তৈরি

Raw PHP দিয়ে প্রোগ্রামিং করলে এটি অনেক খরচসাপেক্ষ হয়। ছোটখাট কোন প্রজেক্টের জন্য Raw PHP ব্যাবহার করা হয়। এর সিকিউরিটি অনেক ভালো। সাধারণত প্রোগ্রামিং করে একটি ওয়েবসাইট তখনই তৈরি করা হয়, যখন আপনার প্রজেক্ট আইডিয়াটি সম্পূর্ণ নতুন বা অন্য কোন সাইটের সাথে মিল নেই। তখন আপনি রেডি কোন CMS ব্যাবহার করতে পারবেন না চাইলেও, তখন আপনাকে অবশ্যই কোডিং করে সাইট তৈরি করে নিতে হবে

ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে প্রোগ্রামিং করে তৈরি

সরাসরি Raw কোডিং করে বড় প্রজেক্ট তৈরি একটু কষ্টসাধ্য হয়ে যায়, তখন ফ্রেমওয়ার্ক হয় আশীর্বাদ সরূপ। কারণ এখানে কমন অনেকগুলো ফরম্যাট তৈরি করা থাকে, যেগুলো লাইব্রেরি থেকে ব্যাবহার করলে কাজ অনেক কমে যায়। অন্যদিকে যে ফিচারগুলো আপনার প্রজেক্টে নতুন, সেগুলোই Raw এর মত করে কোডিং করে তৈরি করতে হয়। এই ধরনের প্রজেক্টে খরচ Raw এর তুলনায় কম।

কনটেন্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (CMS) দিয়ে তৈরি

ইউজার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম যেমন ওয়ার্ডপ্রেস বর্তমান সময়ে ওয়েবসাইটের জন্য গেম চেঞ্জার। এটি ওয়েবসাইটের কাজকে অনেক সহজ করে এনেছে। সাধারনত ওয়েবসাইট গুলোতে যত ফিচার দরকার হয়, তার সবই এখানে তৈরি করা আছে, শুধু নিয়ে নিয়ে তৈরি করা। লক্ষ কোটি থিম এবং প্লাগিন রয়েছে, যা আমাদের ডেভেলপমেন্ট টাইম অনেক কমিয়ে এনেছে। প্রোগ্রামিং করে যে ফিচার দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর সময় লাগতো, সেটি একটা প্লাগিন ইন্সটল করে মুহূর্তেই করে ফেলা যাচ্ছে। যার কারনে এই সিস্টেমে ১ ঘণ্টায়ও একটি সাইট তৈরি করে ডেলিভারি দেয়া যায়। কয়েকদিনেই একটি কোম্পানীর পূর্ণাঙ্গ সাইট ডেলিভার করা সম্ভব।

ওয়ার্ডপ্রেস সাইট তৈরির ক্ষেত্রে কি কি সতর্কতা অবলম্বন করবেন?

CMS যেখানে কাজকে অনেক সহজ করে দিয়েছে, সেখানে কিছু অসাধু ব্যাবসায়ী এই সুবিধার অপব্যাবহার করছে। যারা শুধুমাত্র থিম ইন্সটল আর বেসিক কাস্টমাইজ শিখেই নামমাত্র মূল্যে ওয়েবসাইট তৈরি করছে। অনলাইনে ঘাটলেই এরকম ২ হাজার / ৫ হাজার টাকাতে ওয়েবসাইট তৈরির বিজ্ঞাপনে সয়লাব। যেহেতু, সাধারণ ক্রেতার বোঝার সুযোগ নেই যে তারা এই টাকাতে কি দিচ্ছে, তাই তারাও ভাবছেন যে কম টাকায় হলে বেশী টাকায় কেন?

আমি এখানে একটা উদাহরন দিই। আমি নিজে কেনার সময় বাজারে প্যাকেটজাত চিপস ১০ টাকারটি যদি ৮ টাকায় পাই দরদাম করে, তাহলে আমি কিনবো। কারণ আমি জানি যে, টাকা কম দিলেও চিপসের গুণগত মান একই থাকবে। কিন্তু ১০ টাকার ঝালমুড়ি যে বিক্রয় করে, তার সাথে দরদাম করে আমি কখনোই ১০ টাকার জায়গায় ৮ টাকা দেবো না। কারণ সে আমাকে হয় কাচামরিচ কম দেবে, নাহলে অন্য একটা উপকরণ (যেটার দাম তুলনামূলক বেশী) কম দেবে, যা আমি বুঝতেও পারবো না। তাই আমি পারলে তাকে ২ টাকা বেশি দেবো।

ওয়েবসাইট তৈরির খরচ কিসের উপর নির্ভর করে?

ওয়েবসাইট তৈরি করতে ২ টাকা কম খরচ করলে কি কি ক্ষতি হতে পারে তার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করাই আমার এই পোস্ট লেখার উদ্যেশ্য।

নিরাপদ থিম / প্লাগিন

কম টাকায় যারা ওয়েবসাইট দেয় তারা সাধারণন নিরাপদ থিম প্লাগিন দিতে পারে না। এক একটা থিমের দাম ৪০ ডলার থেকে ১০০ ডলার পর্যন্ত হয়। এখন ১০০ ডলার বা ৯০০০ টাকা দিয়ে থিম কিনে কেউ নিশ্চয় আপনাকে ২ হাজার / ৫ হাজার টাকায় ওয়েবসাইট তৈরি করে দেবে না লস দিয়ে? পৃথিবীতে সম্ভবত এরকম বোকা কেউ নেই যে কি না নিজের পরিবারের জায়গায় জমি বেচে এনে জনসেবা করার জন্য ওয়েবসাইট তৈরি করে দিচ্ছে?

তাহলে তারা কিভাবে ওয়েবসাইট তৈরি করে দিচ্ছে?

তারা প্রিমিয়াম থিম / প্লাগিন এর পরিবর্তে ক্র্যাকড / নালড রিসোর্স ব্যাবহার করছে, যা খুবই বিপদজনক। প্রথম দিকে তেমন কোন সমস্যা হবে না। যখন আপনার ওয়েবসাইট জনপ্রিয় হয়ে উঠবে, তখনি সাইটে ম্যালওয়ার এটাক হবে। এছাড়া ক্র্যাকড থিম দিয়ে ওয়েবসাইট গুগলে ভালো র‍্যাংকিং ও পাওয়া যায় না।

ওয়েবসাইট তৈরির জন্য ভালো মানের হোস্টিং

ভালো মানের হোস্টিং একটু খরচ সাপেক্ষ। হোস্টিং এর দাম নির্ভর করে এর স্পিড, আপটাইম, সার্ভার লোকেশন, রিসোর্স লিমিট ইত্যাদির উপর। অথচ এই বিষয়গুলো কোন কোম্পানি পাবলিকলি ডিসক্লোজ করে না। যার কারনে হোস্টিং এর মান বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের অজানাই থেকে যায়। যে পরিমান হোস্টিং এর দাম ২ হাজার টাকা হওয়ার কথা, একই পরিমান হোস্টিং ২০০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে।

যারা কম টাকায় ওয়েবসাইট তৈরি করে, তারা এই সমস্ত নিম্নমানের হোস্টিং এ সাইট হোস্ট করে কস্টিং মিনিমাইজ করার জন্য। এতে করে আপনার সাইটের স্পিড, আপটাইম সবকিছুর উপর নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়তে পারে।

বেসিক এসইও স্টাকচার

একজন এক্সপার্ট যখন নতুন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করবেন, তখন তিনি বেসিক লেভেলের এসইও এর বিষয়গুলো মাথায় রেখেই করেন, যেন গুগলের কাছে প্রথমবার সাইটটি সাবমিট করার সময় প্রপারলি সেটি অরগানাইজড থাকে। অন্যদিকে যারা নামমাত্র মূল্যে সাইট তৈরি করে, তারা এসব বিষয়ের ধার ধারেনা।

ওয়েবসাইটের স্পিড এবং পারফরমেন্স

ওয়েবসাইট স্পিড অপটিমাইজেশন সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্র্যাকটিস, যেটি ওয়েবসাইট ডিজাইন / ডেভেলপমেন্ট এর বাইরে আলাদাভাবে শিখতে হয়। এটাতে গভীর দক্ষতা না থাকলে একটি ওয়েবসাইট কখনোই ফাস্ট লোডিং হয় না। ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটপ্লেসগুলোতে প্রচুর টাকার বিশাল মার্কেট রয়েছে শুধুমাত্র এই স্পিড অপটিমাইজেশনের। ২০২২ সালের শুরু থেকেই গুগল এই স্পিড এর উপর অনেক গুরুত্ব দিচ্ছে। যেসব ওয়েবসাইটের স্পিড এবং পারফর্মেন্স গুগলের রুলস ফলো করে হচ্ছে না, সেগুলোকে পেনাল্টি দিয়ে র‍্যাংকিং কমিয়ে দিচ্ছে। তাই আপনার ওয়েবসাইট তৈরির সময় এই বিষয়গুলোও মাথায় রাখা দরকার যে, বিল্ডিং তৈরির সময় যদি খরচ কম করি, তাহলে ১০০ বছর সেই বাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকবে এটা আশা করা যায় কি না?

ওয়েবসাইটের সিকিউরিটি

একটি ওয়েবসাইটের সিকিউরিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পার্ট। অনলাইন ইউজার যত বাড়ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হ্যাকারের সংখ্যাও। আপনি নিশ্চয় চাইবেন না যে আপনার বছরের পর বছর সাধনার ওয়েবসাইট কোন হ্যাকারের হাতে চলে যাক। অনেক সময় হ্যাকাররা ওয়েবসাইট হ্যাক করে ইচ্ছাকৃত তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রন না নিয়ে তাতে বিজ্ঞাপন, কিংবা ক্ষতিকর লিংক বসিয়ে রাখে। আপনি নিশ্চিন্তে সাইট চালাচ্ছেন কিন্তু সাইট গুগলে র‍্যাংকিং হচ্ছে না। তাই সিকিউরিটিতে টাকা খরচ করতেই হয়।

কিভাবে বুঝবেন আপনি সঠিক ব্যাক্তিকে ওয়েবসাইট তৈরির কাজ দিচ্ছেন?

যাকে আপনার ব্যাবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবসাইটের কাজটি দিচ্ছেন, তার তৈরি করা আগের ওয়েবসাইটগুলো অবশ্যই দেখবেন। মোবাইল কম্পিউটার সবগুলো ভার্সনে এক পেজ থেকে অন্য পেইজে ব্রাউজ করে দেখবেন স্মুথলি যাচ্ছে নাকি গরুর গাড়ির মত ধাক্কা আর ঝাকুনি দিতে দিতে দিতে যাচ্ছে। তাহলেই বুঝতে পারবেন। যে কোন ধরনের ওয়েবসাইট তৈরির জন্য যোগাযোগ করতে পারেন কাজী নিশাত আইটিতেও।